জ্বালানি তেলের বিষয়ে সামনে এলো নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য

 


মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ঘিরে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট বা দাম বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় তেল নিতে ভিড় করছেন প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল চালকরা। গত কয়েক দিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দিন-রাত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে দেখা গেছে গ্রাহকদের।

 কোথাও কোথাও সেই লাইন পাম্প স্টেশন ছাড়িয়ে প্রধান সড়ক পর্যন্ত চলে যাওয়ায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। তেল নিতে গিয়ে অনেক জায়গায় কথা-কাটাকাটি, উত্তেজনা এমনকি ছোটখাটো বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটছে। অনেক চালক এক পাম্পে তেল না পেয়ে অন্য পাম্পে ছুটে বেড়াচ্ছেন।

 এতে সময় ও জ্বালানি—দুই দিক থেকেই বাড়ছে ভোগান্তি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত তেলের সংকট বা দাম বাড়ার আশঙ্কা থেকেই মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন। ফলে অল্প সময়েই অনেক পাম্পের মজুদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। শনিবার রাজধানীর মিরপুর, ধানমন্ডি, শাহবাগ, বাংলামোটর, প্রগতি সরণিসহ বিভিন্ন এলাকার পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, তেল নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেল ও গাড়ির দীর্ঘ লাইন। অনেক জায়গায় লাইন প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।

 শাহবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে দেখা যায়, গাড়ি ও মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা দুটি লাইন তৈরি হয়েছে এবং সেই লাইন গিয়ে ঠেকেছে পিজি হাসপাতাল পর্যন্ত। মিরপুর কালশীর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালক আবদুল রব বলেন, সকালে কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাননি। পরে দুপুরে আবার লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। তার সামনে এখনও অনেক গাড়ি রয়েছে, তেল পাবেন কি না তা নিয়েও তিনি নিশ্চিত নন। 

স্থানীয়দের অনেকেই বলাবলি করছেন, গত দুই দিনে অতিরিক্ত তেল উত্তোলনের কারণেই অনেক পাম্পে তেলের সংকট তৈরি হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছু ফিলিং স্টেশনে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হক বলেন, আতঙ্কের কারণে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিচ্ছেন। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি চাহিদা তৈরি হয়েছে এবং অনেক পাম্পের মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, শুক্রবার ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সাধারণত তেলবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে এবং এ সময় পাম্পে তেল সরবরাহ করা হয় না। 

মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত সেচ মৌসুমে এই নিয়ম শিথিল করা হলেও এবার সংকটের সময়েও তা শিথিল না করায় সমস্যা আরও বেড়েছে। এদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গত শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রল পাম্প পরিদর্শনে যান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

 আগামী ৯ মার্চ দেশে আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ আসছে, ফলে তেল সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই বলে তিনি জানান। তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি কত দিন চলবে তা নিশ্চিত না হওয়ায় সরকার সতর্কতার অংশ হিসেবে সীমিত আকারে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। তবে সেটি দেখে অনেক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল মজুদ করার চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

 তিনি আরও জানান, দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), এলপিজি এবং অন্যান্য জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এলএনজি সরবরাহের ক্ষেত্রে কাতার ছাড়াও বিকল্প উৎস নিয়ে সরকার কাজ করছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সংকট তৈরি না হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান বলেন, জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। 

তার মতে, শুধু চলতি মাস নয়, আগামী জুন পর্যন্ত দেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত রয়েছে। তিনি আরও জানান, পরিশোধিত তেল চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসবে এবং ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি কোনো প্রভাব এসব উৎসের ওপর নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সংকটের চেয়ে আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদাই বর্তমানে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তাই জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


Next Post Previous Post

মন্তব্য করুন