পারিশ্রমিক দিয়ে ইতিকাফ করানো কি জায়েজ? জেনে নিন ইসলামের বিধান।

 


আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ইতিকাফ। ইসলামী শরিয়তে ইতিকাফের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচিত। ইসলামী ফিকাহ অনুযায়ী ইতিকাফ মূলত তিন প্রকার—ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা এবং নফল।

 এর মধ্যে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কেফায়া। অর্থাৎ কোনো মহল্লা বা এলাকায় যদি অন্তত একজন মুসল্লি ইতিকাফে বসেন, তাহলে সেই এলাকার সবার পক্ষ থেকে এই সুন্নত আদায় হয়ে যায়। কিন্তু যদি পুরো এলাকায় কেউ ইতিকাফ না করেন, তাহলে সেই এলাকার সব মুসলমানই গুনাহগার হবেন। ইসলামী ফিকাহগ্রন্থ যেমন ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ ও ‘আদ্দুররুল মুখতার’-এ এ বিধান উল্লেখ রয়েছে। সাধারণত ইতিকাফ পুরুষদের জন্য মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি ইবাদত, তাই পুরুষদের মসজিদে অবস্থান করেই ইতিকাফ পালন করতে হয়। ইতিকাফকারীর জন্য মুসলমান হওয়া, সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া এবং ইবাদতের বিষয়টি বুঝতে সক্ষম হওয়া জরুরি।

 তরুণ, যুবক কিংবা বৃদ্ধ—যে কোনো বয়সের সুস্থ মুসলমান ব্যক্তি ইতিকাফ করতে পারেন। বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের অনেক এলাকায় রমজানের শেষ দশকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনেক মুসল্লি মসজিদে ইতিকাফে বসেন এবং ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সময় অতিবাহিত করেন। তবে কিছু কিছু এলাকায় দেখা যায়, স্থানীয় লোকজন কেউই ইতিকাফে বসতে চান না। তখন অনেক সময় এলাকার মানুষজন অন্য এলাকা থেকে বা নিজেদের এলাকা থেকেই কোনো দরিদ্র ব্যক্তিকে খাবার, অর্থ বা পারিশ্রমিক দিয়ে ইতিকাফে বসার জন্য অনুরোধ করেন। 

কিন্তু ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের প্রথা সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন আলেমরা। ইসলামি আইন ও ফেকাহশাস্ত্রবিদদের মতে, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাউকে দিয়ে ইতিকাফ করানো বৈধ নয় এবং এভাবে ইতিকাফ করালে তা শরিয়তসম্মত হয় না। কারণ ইতিকাফ মূলত একটি ইবাদত, আর ইবাদতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক দেওয়া বা নেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। রাজধানীর মিরপুর-১২ এলাকায় অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া বায়তুস সালামের ফতোয়া বিভাগের মুশরিফ মুফতি আব্দুর রহমান হোসাইনী বলেন, বিনিময়ের মাধ্যমে ইতিকাফ করা বা করানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ।

 তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু ইতিকাফ একটি ইবাদত, তাই এর বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করা বা কাউকে অর্থ দিয়ে ইতিকাফ করানো শরিয়তসম্মত নয়। তিনি আরও বলেন, এভাবে যদি কেউ ইতিকাফ করে, তাহলে সেই ইতিকাফ দ্বারা সুন্নতে মুয়াক্কাদায়ে কেফায়ার দায়িত্ব আদায় হবে না। ফলে ওই এলাকার মানুষের ওপর থেকে দায়িত্বও মুক্ত হবে না।

 তিনি এ বিষয়ে বিভিন্ন ফিকাহগ্রন্থ যেমন—জামে তিরমিজি, তাবয়ীনুল হাকায়েক, বাদায়েউস সানায়ে, মাবসূত সারাখসী, খুলাসাতুল ফাতাওয়া, ফাতাওয়া খানিয়া ও ফাতাওয়া বাযযাযিয়ার উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন। আলেমদের মতে, ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একান্তভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করা। তাই এ ইবাদতকে কোনোভাবেই পার্থিব লেনদেন বা আর্থিক বিনিময়ের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। বরং মুসলমানদের উচিত নিজেদের দায়িত্ব ও আন্তরিকতা থেকে ইতিকাফ পালন করা এবং অন্যদেরও এ বিষয়ে উৎসাহিত করা। এতে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের মধ্যেই ইবাদতের চর্চা বৃদ্ধি পাবে এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুযোগ তৈরি হবে।

Next Post Previous Post

মন্তব্য করুন