জামায়াত নেতার অবৈধ পাম্পে অভিযান: পানির ট্যাংকেও মিলল জ্বালানি তেল!
পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে জামায়াত সমর্থিত ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম ওরফে আলম হাজীর অবৈধ তেল পাম্পে অভিযান চালিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে ঝুঁকিপূর্ণভাবে জ্বালানি তেল মজুতের অভিযোগে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। শনিবার (৭ মার্চ) বিকেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আলীমের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে এই জরিমানা করা হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ ছিল যে ইসলামপুর গ্রামের জামে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় একটি পাম্পে গোপনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুত করে রাখা হয় এবং তা বাজারে বিক্রি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব তেল সরকার নির্ধারিত নিয়ম না মেনে অবৈধভাবে সংরক্ষণ ও বাণিজ্য করা হচ্ছিল, যা স্থানীয় বাজারে অস্থিরতা তৈরির ঝুঁকি সৃষ্টি করছিল।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) থেকে পাওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বিকেল তিনটার দিকে সেখানে অভিযান শুরু করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে তল্লাশি চালিয়ে পাম্পের ভেতরে প্লাস্টিকের তৈরি বড় বড় ট্যাংকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুত করা অবস্থায় পাওয়া যায়। বিশেষ করে একটি বড় পানির ট্যাংক ব্যবহার করে তেল সংরক্ষণ করা হচ্ছিল বলে অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান। তদন্তের সময় পাম্প কর্তৃপক্ষ পেট্রোল ও অন্যান্য জ্বালানি মজুত এবং বিক্রির বিষয়ে কোনো বৈধ অনুমোদন বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।
এ সময় পাম্প পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আলম হাজীর ভাই আব্দুল হান্নানকে কয়েকটি ধারায় ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং ভবিষ্যতে আইন অনুযায়ী কাগজপত্র ঠিক করার জন্য সতর্ক করা হয়। তবে স্থানীয় অনেকেই প্রশাসনের এই শাস্তিকে যথেষ্ট কঠোর বলে মনে করছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, দীর্ঘদিন ধরেই ওই পাম্পে অবৈধভাবে তেল মজুত ও বিক্রির ঘটনা ঘটছে। তাদের অভিযোগ, লাইসেন্স ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাম্প পরিচালনা করা হলেও বিভিন্নভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের মতে, এর আগেও পাম্পটিকে ঘিরে গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে সেখানে একটি বিস্ফোরণের ঘটনায় দুই শ্রমিক দগ্ধ হয়ে মারা যান। সেই ঘটনার পর অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাম্প পরিচালনার বিষয়টি সামনে এলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তখন কিছুদিন কার্যক্রম সীমিত থাকলেও পরে আবারও আগের মতো ব্যবসা চালু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, এমন ঘটনা বারবার ঘটলেও বড় ধরনের আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। তারা মনে করছেন, শুধুমাত্র জরিমানা দিয়ে দায় শেষ না করে স্থায়ীভাবে অবৈধ পাম্প বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযানে প্রাথমিকভাবে অবৈধ কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হয়েছে এবং পাম্প কর্তৃপক্ষকে কাগজপত্র ঠিক করার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আলীম বলেন, “অভিযানের সময় আমরা দেখতে পাই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে জ্বালানি তেল মজুত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের কাগজপত্র দেখানো যায়নি।
তাই আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হয়েছে এবং সতর্ক করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি নজরদারিতে রেখেছি। ভবিষ্যতে যদি একই ধরনের অনিয়ম আবারও ধরা পড়ে, তাহলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে অভিযুক্ত চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম ওরফে আলম হাজী নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পাম্পটির দেখভালের দায়িত্ব তার ছোট ভাই আব্দুল হান্নানের ওপর রয়েছে এবং তাদের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আছে বলে দাবি করেন।
যদিও অভিযানের সময় সেই কাগজপত্র দেখানো যায়নি। তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্থানীয়দের দাবি, পানির ট্যাংকে গোপনে তেল মজুতের ঘটনা প্রমাণ করে যে পাম্পটিতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে জ্বালানি ব্যবসা চলছিল। বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং প্রশাসনের কাছে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন অনেকেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, নিয়ম না মানলে ভবিষ্যতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন হলে পাম্পটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
